Our Concern
Ruposhi Bangla
Hindusthan Surkhiyan
Radio Bangla FM
Third Eye Production
Anuswar Publication
Ruposhi Bangla Entertainment Limited
Shah Foundation
Street Children Foundation
June 15, 2026
হেডলাইন
Homeপ্রবাসপ্রথম উপন্যাসেই আমেরিকা জয় করলেন বাঙালি তরুণী মেঘা

প্রথম উপন্যাসেই আমেরিকা জয় করলেন বাঙালি তরুণী মেঘা

প্রথম উপন্যাসেই আমেরিকা জয় করলেন বাঙালি তরুণী মেঘা

[author title=”অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়” image=”http://”][/author]

পটভূমিকা কোলকাতা। না, ‘সিটি অফ জয়’ নয়। বরং এক আবছা অন্ধকারের শহরই উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। আর সেই লেখা দিয়েই তিনি এখন বিশ্বের একটা বড় অংশের পাঠকের নজর কেড়েছেন। তাঁর প্রথম উপন্যাসেই সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছেন বাঙালি তরুণী মেঘা মজুমদার। ‘আ বার্নিং’ নামের সেই ৩২০ পাতার উপন্যাসের প্রশংসা এই মুহূর্তে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বা ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’-এর পাতায়। আমেরিকার জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমের বেস্ট সেলার তালিকাতেও উঠে এসেছে এই উপন্যাস। ডেবিউ উপন্যাস হিসেবে ‘আ বার্নিং’ যে খুবই ব্যতিক্রমী, এমন কথা বলেছেন লেখক অমিতাভ ঘোষও। মনে পড়ে যেতেই পারে দু’দশক আগে এমনই এক বাঙালি মেয়ে ঝুম্পা লাহিড়ীর গল্প সংকলন ‘ইন্টারপ্রেটর অব ম্যালাডিজ’-এর কথা। সেটাও ছিল লেখকের প্রথম বই। আর প্রকাশ মাত্রই সেই বই নিয়ে রীতিমত হইচই পড়ে গিয়েছিল পশ্চিমা বিশ্বে।

কোলকাতা শহরের ধুলো-ধোঁয়ায় বেড়ে ওঠা মেঘা এই মুহূর্তে নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা। আমেরিকার হার্ভার্ড ও জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে মেঘা পড়াশোনা করেছেন। সোশ্যাল অ্যান্থ্রোপোলজির ছাত্রী মেঘা যে লম্বা প্রস্তুতি নিয়েই লিখতে এসেছেন, তা ধরা পড়েছে তাঁর লেখনিতেই। একই সঙ্গে এক রুদ্ধশ্বাস আখ্যানকে লিখতে চেয়েছেন মেঘা, যার মধ্যে বুদ্ধির চমকও থাকবে যথেষ্ট পরিমাণে। বলাই বাহুল্য, তাঁর উদ্দেশ্যে তিনি সফল। ইন্টারনেটের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যখন শ্বাসরোধকারী সোশ্যাল বা পলিটিক্যাল থ্রিলারের মিছিল, তখন নতুন প্রজন্মের একজন চিত্রনাট্য না লিখে, ক্যামেরায় হাত না দিয়ে উপন্যাস লেখার মতো এক শ্রমসাধ্য আর্ট ফর্মের দিকে ঝুঁকছেন, তখন বিষয়টা ভাবায়। মেঘার নিজের কথাতেই, নেটফ্লিক্সের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে এমন এক উপন্যাসই লিখতে চেয়েছেন তিনি। ওয়েব সিরিজের গতিকে উপন্যাসে ধরতে পারার ব্যাপারে তিনি সফল। আর তাঁর এই সাফল্যকে খোলাখুলি স্বীকৃতি দিচ্ছেন অগণিত পাঠক এবং অবশ্যই গণমাধ্যম।

এই মুহূর্তে মেঘার উপন্যাসকে ঘিরে শুরু হয়েছে রীতিমত হইচই। নিউ ইয়র্ক টাইমস ‘আ বার্নিং’য়ের আখ্যান কাঠামোকে তুলনা করেছে জাপানের কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়ার ছবির ক্যামেরা টেকনিকের সঙ্গে। সে প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ‘কুরোসাওয়া তাঁর ছবিতে তিনটি ক্যামেরার নজরকে রাখতেন। এর মধ্যে একটি হলো ‘গেরিলা নজর’, যা মূলত আখ্যানকে অন্তর্ঘাতের দিকে নিয়ে যায়।’ মনে রাখতে হবে, যাঁর উপন্যাস নিয়ে এই উপমা উঠে আসছে, তিনি নেহাতই তরুণী আর এটিই তাঁর প্রথম উপন্যাস। নিউ ইয়র্ক টাইমস এই গ্রীষ্মে যে চার জন লেখককে উল্লেখযোগ্য বলে বেছে নিয়েছে, ‘আ বার্নিং’-এর লেখক রয়েছেন সেই তালিকায়। ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’ প্রশংসা করেছে ঔপন্যাসিকের সাহসিকতার।

সত্যিই এক দুঃসাহসী প্রজেক্ট মেঘার প্রথম উপন্যাস। দুর্দমনীয় গতির এই উপন্যাসকে তার প্রকাশনা সংস্থা ‘থ্রিলার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে থ্রিলার বলতে আজ থেকে দু’দশক আগে যা বোঝাত, আজ তা আর বোঝায় না। বদলে যাওয়া বিশ্বে অনিবার্য ভাবে বদলে গিয়েছে থ্রিলারের সংজ্ঞা। থ্রিলার মানেই যে অপরাধী আর গোয়েন্দার ইঁদুর-বিড়াল দৌড় নয়, সেই প্রমাণ রেখেছেন সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ডের লেখকরা। অপরাধ আর তদন্তকে ছাপিয়ে তা বিস্তৃত হয় সমাজ, রাষ্ট্র, ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্বের গভীরে। সেই বদলে যাওয়া ধারণারই একটা বিশেষ উদাহরণ ‘আ বার্নিং’, এমনই বলছেন ‘গুডরিডস’ বা ‘অ্যামাজন’-এর রিভিউ-কর্তা সাধারণ পাঠক। মেঘার উপন্যাসের ‘থ্রিল’ উঠে আসে আপাত-অচেনা সব চরিত্র আর তাদের ততধিক অচেনা পরিমণ্ডল থেকে।

‘আ বার্নিং’-এর কেন্দ্রে রয়েছে ‘জীবন’ নামের একটি মেয়ে। কোলকাতারই কোনও বস্তির বাসিন্দা জীবন ধর্মে মুসলমান। জীবন একটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিল। একটি ট্রেনে সে অগ্নিসংযোগ করতে দেখেছিল কিছু লোককে। এই ঘটনায় শ’ খানেক লোক মারা যায়। আর পুরো ঘটনাটিই ঘটে পুলিশের সামনে। পুলিশ সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘটনাটি দেখেছিল মাত্র। জীবন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়— ‘যদি আপনার-আমার মতো সাধারণ মানুষকে পুলিশ সাহায্য না করে, শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের মৃত্যুদৃশ্য দেখে, তা হলে কি এর মানে এ-ও দাঁড়ায় না যে, সরকারও সন্ত্রাসবাদী?’ জীবনের ধারণা ছিল না যে, এই ‘সামান্য’ কারণে তাকে গ্রেফতার হতে হবে। পড়তে হবে রাষ্ট্রের রোষে।

‘আ বার্নিং’ জীবনের কাহিনি হলেও এখানে সে ছাড়াও রয়েছে আরও দুই কুশীলব। এক জন হলেন জীবনের স্কুলের শরীর শিক্ষার শিক্ষক। ‘পিটি টিচার’ নামে পরিচিত সেই ভদ্রলোক চরম দক্ষিণপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী (‘শরীর’ ও রাষ্ট্রের এক অবচেতনগত সম্পর্ক এখানে ছায়া ফেলে)। অন্যজন লাভলি। তিনি তৃতীয় লিঙ্গের। সমাজে যাঁর পরিচয় ‘হিজড়া’ হিসেবে। পিটি টিচার এবং লাভলিরও নিজস্ব স্বপ্ন রয়েছে। প্রথমজন এক দক্ষিণপন্থী রাজত্বের প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন আর অন্যজন দেখেন বলিউডে আত্মপ্রতিষ্ঠার। কার্যত তিনটি পৃথক বয়ানের আশ্রয়েই গড়ে উঠেছে এই উপন্যাস। জীবন, পিটি টিচার এবং লাভলি। এর মধ্যে লাভলি এক অদ্ভুত ভাষায় কথা বলে। তা ইংরেজি। কিন্তু ভাঙা। পরিচিত সিনট্যাক্সের থেকে দূরের এক ভাষা। জীবন ও পিটি টিচারের বয়ান যদি দুই মেরুর প্রতিনিধিত্ব করে, লাভলির বয়ান তবে এই মেরু দুটির মাঝখানে কোথাও একটা অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে চলে। কুরোসাওয়ার সেই ‘তৃতীয় ক্যামেরা’ এখানে লাভলি। সে-ই ‘গেরিলা নজর’ এই আখ্যানে। বই আর অক্ষরের পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠলেও মেঘা এমন এক পরিসরকে তাঁর লেখায় ধরতে চেয়েছেন, যা কাগজ আর অক্ষরের দুনিয়া থেকে অনেকটাই দূরে। তাঁর চরিত্ররা তথাকথিত ইন্টেলেকচুয়াল সমাজের কেউ নয়। কোলকাতা নামের শহরটার এমন কিছু দিককে তিনি তুলে এনেছেন, যা অস্বস্তিকর। অথচ যার অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না কিছুতেই।

পুলিশি হেফাজতে থাকার সময় জীবনের একটা সাক্ষাৎকার নেন একজন সাংবাদিক। জীবন তাঁকে নিজের গল্প বলতে গিয়ে থমকে যায়। কোথা থেকে শুরু করবে সে? ঠিক কোথা থেকে তার সমস্যার শুরু? সেদিনের সেই ট্রেন পোড়ানোর সাক্ষী থাকা? নাকি তারও আগে তার স্কুল ছাড়তে বাধ্য হওয়া? নাকি তারও আগে গ্রাম থেকে উচ্ছিন্ন হয়ে কোলকাতার বস্তিতে এসে ওঠা? দুর্ভাগ্যের সূত্রপাত ঠিক কোথা থেকে ঠাহর করা যায় না। জীবন যেন এখানে সাম্প্রতিক ভারতের এক বিপুল জনতার প্রতিনিধিত্ব করে। ক্রমাগত শিকড় থেকে উপড়ে তোলা, একের পর এক আশ্রয় থেকে বিচ্যুত মানুষের মুখপাত্র হয়ে ওঠে সে। এর সঙ্গেই যুক্ত হতে থাকে পুলিশের নির্যাতন, পানীয় জলের জন্য হাহাকার, সীমাহীন দারিদ্রের এক নিরবচ্ছিন্ন আখ্যান।

পিটি টিচার যদি এক সম্ভাব্য রাষ্ট্রের হয়ে বয়ান দেন, লাভলির বয়ানে উঠে আসে এক ভগ্নস্বপ্নের দেশ। এই দুই বয়ানের মাঝখানে রয়েছে জীবন (সে পিটি টিচার আর লাভলির মাঝখানের যোগসূত্রও বটে। কারণ, সে লাভলিকে ইংরেজি পড়ায়।) পিটি টিচারেরও অপ্রাপ্তি রয়েছে। তিনি স্বীকৃতি চান। তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস কেবলমাত্র সেই আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরেই পাক খায়। লাভলির দারিদ্র, সমাজে তার প্রান্ত-বহির্ভূত অবস্থান আর জীবনের জীবনে স্থিতির চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা— এই-ই কি আজকের ভারতবর্ষ? সাম্প্রতিক রাজনীতি এখানে যেন এক বিশাল ছায়া ফেলা কোনও অজানা প্রাণী। যার উপস্থিতি একটা দমচাপা পরিস্থিতিকে সর্বদা বজায় রাখে, যার সঙ্গে সহবাস করছে এই দেশ, সহবাস করছে এ দেশের অগণিত মানুষ।

জীবন আর লাভলি যদি যন্ত্রণায় পিষ্ট হতে থাকে, পিটি টিচারেরও যন্ত্রণা কম নয়। অপ্রাপ্তির এক বিশাল মানচিত্র এই উপন্যসের পরতে পরতে। লকডাউন আর অতিমারির দিনে প্রকাশিত এই উপন্যাস যেন ভারতের উপরে প্রলম্বিত এক অজানা ভয়ের ছায়াকেই তুলে ধরে। রাজনীতিকে অতিক্রম করে সাধারণ মানুষের ছোটখাটো দুঃখসুখের আখ্যানকে কিছুতেই ছোঁওয়া যায় না। রাষ্ট্র তার অতিমাত্রিক অস্তিত্ব নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। সেখানে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া উপায় থাকে না কারওরই। জীবন যে নির্দোষ, তা প্রমাণিত হতে পারে পিটি টিচার এবং লাভলির সাক্ষ্যে। ঘটনার আবর্ত কি গড়ায় সেই পর্যন্ত?

এই অতিরাষ্ট্রিকতাকেই লিখতে চেয়েছেন মেঘা তাঁর প্রথম উপন্যাসে। এই আখ্যান কি শুধুমাত্র ভারতের? না কি যে কোনও ভূগোলেই বেড়ে ওঠা রাষ্ট্রিক সন্ত্রাস আর তার চাপে পিষ্ট জনজীবনের? এই মুহূর্তে পাঠকের সামনে এই প্রশ্নটিকেই রাখছে ‘আ বার্নিং’। দহন যে এক প্রতীকী অস্তিত্ব নিয়ে আমাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে, এই প্রশ্নটিকেই আগুনের গোলার মতো ছুড়ে দিচ্ছে এই রচনা। জীবন বা লাভলির থেকে খুব বেশি দূরে নন আমেরিকায় পুলিশি হেফাজতে নিহত জর্জ ফ্লয়েড— এই প্রসঙ্গও যেন উঠে আসে এই আখ্যানে। ইসলামোফোবিয়ায় তো আক্রান্ত পশ্চিম গোলার্ধও। জীবনের ধর্মীয় আত্মপরিচয় বারবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় ‘আদার’ হিসেবে দেগে দেওয়া মানুষের অন্তঃস্থলকে। এখানেই লক্ষ্যভেদ করেছেন এই বাঙালি মেয়ে। নিশ্চিত আত্মবিশ্বাসে কোলকাতার আঞ্চলিকতা টপকে এই উপন্যাসকে আন্তর্জাতিক করে তুলতে পেরেছেন। উপন্যাসের জনপ্রিয়তায় মেঘা নিজেও থ্রিল্ড।’ সম্প্রতি টুইট করে জানিয়েছেন, যে সময়ে তিনি এই উপন্যাস লিখেছেন, তখন ভাবতেও পারেন নি যে, আমেরিকায় কেউ তাঁর বই সম্পর্কে আগ্রহী হবেন। কিন্তু এই মুহূর্তে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর বেস্ট সেলার তালিকায় ‘আ বার্নিং’। রোমাঞ্চিত হওয়ার মতোই বিষয় বটে। ⛘

আনন্দবাজার

Share With:
Rate This Article