কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে দিল্লিতে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত
ভারতের দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের তিন কৃষি আইন বাতিলের দাবীতে বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে প্রায় চার সপ্তাহ ধরে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন ভারতের কৃষকরা। জলকামান, টিয়ারশেল ব্যবহার করেও তাদের ওঠানো যায়নি। প্রচণ্ড শীতের মধ্যে তাঁবু টাঙিয়ে, ট্রাক্টর ও অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতি সড়কে রেখে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
দফায় দফায় কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কৃষকদের আলোচনা হয়েছে, কিন্তু কোনও সমাধান মেলে নি। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকরা সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে নানা পার্শ্ব কর্মসূচি পালন করে চলেছেন। ২৩ ডিসেম্বর ‘কৃষক দিবসে’ সারা দেশের কৃষকদের একবেলা না খেয়ে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন আন্দোলনের সংগঠকরা। এছাড়া ঘটি-বাটি-থালা বাজিয়ে ২৭ ডিসেম্বর নরেন্দ্র মোদির ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানের প্রতিবাদ জানাবেন তারা।
ভারতের কৃষকদের এ আন্দোলন বিশ্ব মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ডয়েচে ভেলে, আল-জাজিরাসহ বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেল ছাড়াও বিশ্বের প্রভাবশালী প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়া গুরুত্বের সঙ্গে আন্দোলনের খবর প্রচার করছে। এ আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রীসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অধিকার সচেতন গণতন্ত্রকামী মানুষ। কৃষকদের ওপর পুলিশের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন অনেকে।
আন্দোলনরত কৃষকদের বক্তব্য, এ আইনের ফলে কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণের নিয়ন্ত্রণ বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে চলে যাবে। দেশের কৃষি ধ্বংস হয়ে যাবে। এ আইন বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরে যাবেন না।
কিন্তু কৃষকদের দাবী মানতে রাজি নয় মোদি সরকার। তবে আলোচনার নামে তাদের নাটক কিন্তু চলছে। এরই মধ্যে তারা তলে তলে নিজেদের (বিজেপি-আরএসএস) কৃষক সংগঠনকে আন্দোলনের বিরুদ্ধে নামিয়ে দেয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
দিল্লিমুখী রাস্তা অবরোধে মূলত পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কৃষকরা অংশ নিচ্ছেন। এছাড়া আরও কয়েকটি রাজ্য থেকে কৃষকরা সেখানে গেছেন। এদিকে এ আন্দোলনের সমর্থনে সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন হচ্ছে বিভিন্ন রাজ্যে। কৃষকদের ডাকে ৮ ডিসেম্বর ভারতজুড়ে ধর্মঘট পালিত হয়েছে। এতে কর্যত গোটা দেশ থমকে যায়। আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে কংগ্রেস, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)সিপিএম, সিপিআইসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল।
কৃষকদের ন্যায্য দাবী মেনে নিতে এসব দলের পক্ষ থেকে ১০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দকে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে। এ সময় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, সিপিএম নেতা সিতারাম ইয়েচুরি, সিপিআইয়ের ডি রাজা, এনসিপি নেতা শারদ পাওয়ার, ডিএমকের ইলানগোভানক উপস্থিত ছিলেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধির স্মারকলিপি প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি উপস্থিত হননি। অনেকে মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নির্বাচন সামনে থাকায় কংগ্রেস-সিপিএমের সঙ্গে একমঞ্চে যেতে চাইছে না তৃণমূল। কারণ আগামী রাজ্য নির্বাচনে তৃণমূলের বিরুদ্ধে জোট হয়ে লড়বে কংগ্রেস ও সিপিএম।
রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দিয়ে বেরিয়ে রাহুল গান্ধী সাংবাদিকদের বলেন, কৃষকরাই ভারত। তাদের কেউ পিছু হটাতে পারবে না। কারণ তারা বুঝতে পেরেছেন, যদি এ আইন মেনে নেয়া হয় তাহলে তাদের ভবিষৎ অন্ধকার।’ তিনি আরও বলেন, আমি কৃষকদের বলছি, যদি আজ আপনারা দৃঢ় হয়ে না দাঁড়ান, তাহলে আর কখনও সুযোগ পাবেন না। আমরা সবাই আপনাদের সঙ্গে আছি।
সীতারাম ইয়েচুরি বলেন, অগণতান্ত্রিকভাবে কারও সঙ্গে ঠিকমতো আলোচনা না-করে কৃষি বিল পাস করিয়েছে সরকার। যে আন্দোলন চলছে, তা ঐতিহাসিক এবং ক্রমশ আরও তীব্র হবে। ডি রাজা বলেন, কৃষকদের সঙ্গে যে অন্যায় হচ্ছে, তাতে কোনো রাজনৈতিক দল মুখবুজে থাকতে পারে না।
কৃষি আইনের বিরোধিতা সংক্রান্ত যে স্মারকলিপিটি বিরোধীদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে দেয়া হয়েছে, তাতে অগণতান্ত্রিকভাবে সংসদে কৃষিবিল পাস করানোর অভিযোগটি রয়েছে। বলা হয়েছে- এ আইন দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করবে। দেশে কৃষি ব্যবস্থা ও কৃষকদের ধ্বংস করবে। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বলে আর কিছু থাকবে না এবং এ আইনের ফলে কৃষি ব্যবস্থাকে কার্যত কর্পোরেটদের হাতে বন্ধক হিসেবে তুলে দেওয়া হয়েছে।❐








