সাময়িক প্রভাবে ভুগছে ইউরোপ, দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয়ে পড়বে রাশিয়া
প্রকট আকার ধারণ করেছে জ্বালানি সংকট। পর্বতসম উচ্চতায় পৌঁছেছে মূল্যস্ফীতি। ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপজুড়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যদিও এ প্রভাব স্বল্পস্থায়ী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে বসবাসের অভিজ্ঞতা রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রুবল ও মূল্যস্ফীতিকে স্থিতিশীল করতে সহায়তা করেছে। তবে বিদেশী বিনিয়োগ হারিয়ে এবং বেকারত্ব বেড়ে দীর্ঘমেয়াদে দেশটিকে যুদ্ধের জন্য মূল্য দিতে হবে।
বর্তমান সংকট সামাল দিতে ইতালির ফুড ব্যাংকগুলো আরো বেশি মানুষকে খাওয়াচ্ছে। জার্মান সরকার নাগরিকদের প্রতি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছে। দেশটি প্রাকৃতিক গ্যাস রেশনিং এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করছে। ডলারের বিপরীতে ইউরোর বিনিময় হার ২০ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। সবমিলিয়ে অঞ্চলটিতে মন্দার আশঙ্কা বাড়ছে। যদিও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ইউরোপের এসব প্রভাব স্বল্পস্থায়ী হবে। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয়ে পড়বে রাশিয়া।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণেই ইউরোপজুড়ে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। এ যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়ার বিস্তৃত খাতে আরোপিত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাও এমন পরিস্থিতির বড় একটি কারণ। ক্রেমলিন ধীরে ধীরে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে লাগাম টানছে। চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে ইউরোপীয় শিল্প খাত। এটি কভিডের বিপর্যয় কাটিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে মন্দায় পড়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
তবে ইউরোপের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ স্বল্পমেয়াদি। ৮ দশমিক ৬ শতাংশের রেকর্ড মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানির ঘাটতি মোকাবেলা করে শীতকাল অতিক্রম করা। সংকট আরো খারাপ হলে ঘর উষ্ণ রাখার জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস রেশনিংয়ের মুখোমুখি হতে পারে দেশগুলো।
মিউনিখের বাইরে পিডিংয়ের একটি বৃহৎ দুগ্ধ সমবায় প্রতিষ্ঠান মলকেরাই বার্চটেসগ্যাডেনার ল্যান্ড। প্রতিষ্ঠানটির সদস্য ১ হাজার ৮০০ জন কৃষকের ৫০ হাজার গাভী প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ লিটার দুধ দেয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বার্নহার্ড পয়েন্টনার বলেন, জ্বালানির অভাবে যদি ডেইরি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কৃষকরা পথে বসে যাবে। তাদের গাভী থেকে সংগৃহীত দুধ ফেলে দিতে হবে। আমরা প্যাকেজিংসহ অন্য জিনিসপত্রও মজুদ করা শুরু করেছি। তবে সেগুলো দিয়ে মাত্র কয়েক সপ্তাহ প্রতিষ্ঠানটি চালিয়ে নেয়া সম্ভব।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, উচ্চমূল্যের কারণে ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় চলতি বছরের শেষ নাগাদ মন্দার আশঙ্কা রয়েছে। ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে সরকারগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ঠিক কতটা বিনিয়োগ করবে। এ খাতে বিনিয়োগ ও কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া অঞ্চলটি বিপর্যয়ে পড়তে পারে।
ইউরোপ যখন যুদ্ধের প্রভাবে বিপর্যস্ত, ঠিক সে সময়ে রাশিয়া ব্যাপক সরকারি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে রুবলের বিনিময় হার, পুঁজিবাজার ও মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল করতে সক্ষম
হয়েছে। পশ্চিমা গ্রাহকরা পিছিয়ে যাওয়ায় দেশটি ছাড়মূল্যে এশিয়ায় জ্বালানি তেলের ক্রেতা খুঁজছে।
উচ্চ জ্বালানি ব্যয় রাশিয়াকে উপকৃত করছে। কারণ মস্কো জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান রফতানিকারক। এ কারণে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পুরোপুরি প্রভাব এখন পর্যন্ত আড়াল করতে পেরেছে দেশটি। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সম্পূর্ণ পতন এড়াতে কৌশল অবলম্বন করছে মস্কো। তবে হারানো বিনিয়োগ, বেকারত্ব হার বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের আয় কমার মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থবিরতা রুশ অর্থনীতিকে গ্রাস করতে পারে।
এরই মধ্যে দেশটির নাগরিকরা ব্যয় কমিয়ে দিয়েছেন। মস্কো থেকে ৪৪০ কিলোমিটার দূরে নিঝনি নভগোরোডে বসবাসকারী সোফিয়া সুভোরোভা পারিবারিক বাজেটে চাপ অনুভব করছেন। সুপার মার্কেটে কেনাকাটার সময় তিনি একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আমরা এখন আর খাবার অর্ডার করি না। পাশাপাশি ক্যাফেতে যাওয়া ও বিনোদনমূলক কাজও কমাতে হয়েছে।
যুদ্ধের আগের তুলনায় ডলারের বিপরীতে রুবলের বিনিময় হার শক্তিশালী। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি হ্রাস একটি বিভ্রান্তিকর চিত্র তুলে ধরছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের রুশ অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ জ্যানিশ ক্লুজ একটি বিশ্লেষণে লিখেছেন, রাশিয়ার মূল্যস্ফীতির হার প্রকৃত অর্থ হারিয়েছে। মূলত চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী হয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইলিয়া মাতভিভের মতে, ২০২০ সালে প্রায় ২৮ লাখ রুশ নাগরিকের বিদেশী বা মিশ্র মালিকানার প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্মসংস্থান হয়েছিল। সরবরাহকারীদের বিবেচনায় নেয়া হলে প্রায় ৫০ লাখ কর্মস্থান বিদেশী বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। এ সংখ্যা দেশটির মোট কর্মশক্তির ১২ শতাংশ। সুতরাং বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম বন্ধের অর্থ হলো বিপুলসংখ্যক রুশ নাগরিক চাকরিহীন হয়ে পড়বে।
সাম্প্রতিক প্রবণতা অনুসারে, বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো রুশ অংশীদারদের মাধ্যমে চালু রাখার চেষ্টা করছে মস্কো। এ পদক্ষেপ এবং সরকারি চাকরির আধিক্য বাড়িয়ে দেশটি হয়তো ব্যাপক বেকারত্ব প্রতিরোধ করতে পারবে। তার পরও অর্থনীতি অনেক কম উৎপাদনশীল হবে। পাশাপাশি গড় প্রকৃত আয়ে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা দেবে। ফলে ভোক্তা ব্যয় হারিয়ে মন্দায় পড়বে রুশ অর্থনীতি।








