বিশ্ব জুড়ে ঋণ সংকটে
ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে উদীয়মান অর্থনীতির কয়েকটি দেশের বিদেশি ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ঋণ সংকট এমন পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে তাতে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের মন্দার দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার কম থাকা অবস্থায় গত এক দশকে অনেক উন্নয়নশীল দেশে জমেছে ঋণের পাহাড়। এর মধ্যে সিংহভাগ ছিল কভিডসংশ্লিষ্ট ব্যয়। রাশিয়ার আক্রমণ এবং তাদের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্য বাড়তে শুরু করলে, বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে সুদের হার বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। ইসলামাবাদ থেকে কায়রো, বুয়েনস এইরেস থেকে তিউনিস; সব দেশের কর্মকর্তারা মহামারীর সঙ্গে আমদানির মূল্যবৃদ্ধি ও ঋণ পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন।
সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা ঘোষণা দিয়েছে, তারা বিদেশি ঋণ পরিশোধ করবে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে জরুরি আর্থিক সহযোগিতাও চেয়েছে দেশটি। শ্রীলঙ্কার অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মহামারী, ইউক্রেন যুদ্ধ ও পর্যটনের রাজস্ব কমে যাওয়ায় তারা ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। সম্প্রতি আইএমএফ একটি প্যানেল আলোচনার আয়োজন করে। এতে অংশ নেওয়া হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ কেনেথ রগোফ বলেন, ‘রাষ্ট্র খেলাপি হবে। আরও সংকট দেখা দেবে। যখন আমরা এখনকার পরিস্থিতিতে পড়ি তখন যেকোনো কিছু সম্ভব।’ অবশ্য আইএমএফ এ পর্যায়ে বৈশ্বিক ঋণ সংকটের আভাস দিচ্ছে না। সংস্থাটির কৌশল, নীতি ও পর্যালোচনা পরিচালক সেইলা পাজারবাসিওগলু বলেন, ‘এটি একটি বড় ঝুঁকি যা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ সংকট সমাধানের ফ্রেমওয়ার্কের বিস্তৃতি ও ত্বরান্বিত করার বিষয়টি থাকবে আসন্ন জি-২০ সম্মেলনের অগ্রাধিকার তালিকায়।’ জোটভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা সোমবার ওয়াশিংটনে মিলিত হবেন। উপস্থিত থাকবে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক। পাজারবাসিওগলু আরও জানান, ২০২০ সালে বিশ্বের রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও পরিবারের ঋণ ২৮ শতাংশ-পয়েন্ট বেড়েছে। যা এখন বিশ্বের মোট উৎপাদনের ২৫৬ শতাংশ। এ মাত্রায় ঋণ বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দুটি বিশ্বযুদ্ধের সময়ও দেখা যায়নি।
সুদের হার কম ও দৃঢ় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে ধনী দেশগুলোকে ক্রমবর্ধমান ঋণ নিয়ে খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হবে না। তবে অনেক উন্নয়নশীল অর্থনীতি বেশি চাপ অনুভব করছে। নিম্ন আয়ের ৬০ শতাংশ; প্রায় ৭০টি দেশ মহামারীতে বৈশ্বিক ঋণ পরিশোধ স্থগিত কর্মসূচিতে যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। আইএমএফের মতে, এ দেশগুলো ২০২০ সালে ঋণ দুর্ভোগে পড়ার উচ্চঝুঁকিতে ছিল কিংবা ইতিমধ্যে দুর্ভোগে পড়েছে। ২০১৫ সালের তুলনায় এ ঝুঁকি ছিল ৩০ শতাংশ বেশি। যখন কোনো দেশ আর্থিক বাধ্যবাধকতা পূরণে ব্যর্থ হয় এবং ঋণ কাঠামো পুনর্গঠনের প্রয়োজন হয় তখন ঋণকে ‘দুর্ভোগ’ বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নতুন ও অনভিজ্ঞ ঋণদাতাদের আবির্ভাবের কারণে ঋণ জটিলতায় থাকা দেশগুলোকে সহযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
আইএমএফ বলছে, ৭৩টি উচ্চঋণগ্রস্ত দেশে চীনের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ২০০৬ সালের ২ শতাংশের তুলনায় ২০২০ সালে বেড়ে হয়েছে ১৮ শতাংশ। বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১১ শতাংশ। একই সময়ে বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক এবং পশ্চিমা ধনী দেশগুলোর ঋণদাতা ‘প্যারিস ক্লাব’-এর দেওয়া ঋণের পরিমাণ ৮৩ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৫৮ শতাংশ।








