‘হিজাব না পরায় পোশাক খুলতে বাধ্য করে ইরানি পুলিশ’
ইরানে হিজাব না পরলেই ‘যৌন শাস্তি’ দেওয়া হয় বলে বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন এক তরুণী। মেরি মোহাম্মাদি নামের ওই তরুণীর দাবি, হিজাব ছাড়া দেখলে পুলিশ এমনকি নারীদের পোশাক খুলতেও বাধ্য করে।
ইরানের এক মুসলিম পরিবারে জন্মেছিলেন মেরি মোহাম্মাদি। পরে তিনি ধর্ম পরিবর্তন করেন। ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেন মেরি। তার পর থেকেই দেশের মাটিতে তার জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরান ত্যাগ করতে বাধ্য হন মেরি। বর্তমানে বাস করছেন আমেরিকায়। মাহশা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে সংবাদমাধ্যমের কাছে মেরি মুখ খুলেছেন। তাকে দেশের মাটিতে কী কী সহ্য করতে হয়েছিল, রাখঢাক না করেই সে সব জানিয়েছেন।
#FPExclusive | 'Was forced to take off all my clothes at detention center after being arrested,' Iranian Christian activist @marymohammadii tells @AnnuKaushik253 #IranRevolution #IranProtests2022 #MahsaAmini
Read the full interview- https://t.co/nkc9hyO4ir pic.twitter.com/ND3ALosgJT
— Firstpost (@firstpost) October 17, 2022
মেরির দাবি, ২০২০ সালে এক বার ঠিক মতো হিজাব না পরার ‘অপরাধে’ তাকে আটক করেছিল পুলিশ। রাখা হয়েছিল তেহরানের কাছেই একটি ডিটেনশন সেন্টারে।
সেই ডিটেনশন ক্যাম্পে তাকে পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন মেরি। যদিও সেখানে সকলেই ছিলেন নারী, তবুও প্রশাসনের এই ভূমিকার তীব্র নিন্দা করেছেন তিনি।
মেরির অভিযোগ, ইরানে মেয়েদের দমিয়ে রাখার জন্য যৌন হেনস্থার আশ্রয় নেয় প্রশাসন। নানা ভাবে মেয়েদের হুমকি দেওয়া হয়। এটাই ইরান সরকারের প্রতিবাদী স্বর দমনের কৌশল।
ইরানে মুসলমান মেয়েদের সঙ্গে অমুসলমান মেয়েদেরও হিজাব পরতে হয়। দেশের আইন অনুযায়ী তা বাধ্যতামূলক। মেরি ধর্ম পরিবর্তন করার পরও তাকে তাই হিজাব পরে মাথা ও শরীরের বাকি অংশ ঢেকে রাখতে হত।
২৪ বছর বয়সি এই ইরানি সমাজকর্মী জানিয়েছেন, ২০১৯ সালে একটি বাসে তেহরান যাচ্ছিলেন তিনি। গরম লাগায় মাথা থেকে হিজাব কিছুটা সরিয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে এগিয়ে আসেন এক আদ্যোপান্ত হিজাব পরিহিতা নারী। তিনি মেরিকে কাপড় দিয়ে মাথা ঢাকতে বলেন।
কিন্তু অপরিচিত ওই নারীর কথায় রাজি হননি তরুণী। তিনি বাসেই তার সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন। এমনকি ওই নারী তাকে আক্রমণ করেন বলেও অভিযোগ। সেই হামলায় মেরির মুখ কেটে গিয়েছিল।
রক্তাক্ত মুখ নিয়ে তিনি থানায় গিয়েছিলেন বিচার চাইতে। কিন্তু অভিযোগ, তার কথায় পুলিশ কান দেয়নি। তার অভিযোগ গ্রহণ করা হয়নি। অভিযুক্ত নারীকে ছেড়ে দিয়ে মেরিকে থানায় আটকে রাখা হয়েছিল।
মেরি জানিয়েছেন, ইরানে নীতিপুলিশির বাড়াবাড়িতে তিনি এবং তার মতো স্বাধীনচেতা মেয়েরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। গোঁড়া মুসলমানরাও মেয়েদের উপর একই ভাবে ছড়ি ঘোরান। ফলে দেশে মেয়েদের স্বাধীন ভাবে বাঁচার পরিবেশই নেই।
২০১৭ সালে ইসলাম ত্যাগ করে মেরি খ্রিস্টান হয়েছিলেন। তার পর থেকেই জীবনের নানা ক্ষেত্রে তাকে বাধার সম্মুখীন হতে হয় বলে অভিযোগ। তার বিশ্ববিদ্যালয় কোনও কারণ ছাড়াই তাকে বরখাস্ত করে। ধর্মের কারণে কাজও হারান মেরি।
তিনি জানিয়েছেন, যে স্বাস্থ্যচর্চা কেন্দ্রে তিনি চাকরি করতেন, অতিমারির সময় তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে সেখানে আর তাকে ফেরানো হয়নি।
ইরানে মেয়েদের উপর চাপিয়ে দেওয়া এই ধরনের দমনমূলক আইনের বিরুদ্ধে যারা মুখ খোলেন, তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয় বলে দাবি করেছেন ‘দেশছাড়া’ মেরি। তিনি জানিয়েছেন, প্রতিবাদীদের উপর যৌন শোষণ ইরানের প্রশাসনের অন্যতম হাতিয়ার।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর ইরানের রাজধানী তেহরানে ২২ বছরের তরুণী মাহশা আমিনিকেও হিজাব না পরার কারণে গ্রেপ্তারের পর পুলিশি হেফাজতে তার মৃত্যু হয়। তার পর থেকে দেশটিতে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। মেরির মতোই তিনিও প্রশাসনের চোখরাঙানির শিকার হয়েছিলেন।
মাহশার মৃত্যুর প্রতিবাদে পথে নামেন ইরানের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সাধারণ মানুষ। মেয়েরা প্রকাশ্যে হিজাব পুড়িয়ে, মাথার চুল কেটে ফেলে প্রতিবাদে শামিল হন। আন্দোলনকারীদের উপর ইরান সরকারের নিরাপত্তারক্ষীদের অত্যাচারের খবরও প্রকাশ্যে এসেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ইতিমধ্যেই প্রায় ২৫০ জনকে গুলি করে হত্যা করেছে ইরানের পুলিশ।
মেরির মতে, ইরানবাসীর আর চুপ করে থাকলে চলবে না। ইরানে বিপ্লব প্রয়োজন। মাহশা-কাণ্ডের পর যে আন্দোলন দেশ দেখেছে, তেমন আরও ঝাঁঝালো আন্দোলন ইরানে বিপ্লব ঘটাতে পারবে বলে মনে করেছেন মেরি।
একই সঙ্গে মেরির ধারণা, তার দেশের জনগণ জেগে উঠেছে। বিপ্লবের সে দিন আর বেশি দেরি নেই। ইরানের ইতিহাসে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় বলে মনে করছেন মেরি।
গত বুধবার মাহসা আমিনির মৃত্যুর ৪০তম দিনে ইরানের নতুন করে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। ১২২টি শহর ও ১০৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। বুধবার ও বৃহস্পতিবার এস বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে আরও ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছে, লাগাতার বিক্ষোভ–সংঘাতে এখন পর্যন্ত ইরানে ২৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩০ সদস্য রয়েছেন। আরও রয়েছে ৩৬ শিশু–কিশোর। এ ছাড়া বুধবার পর্যন্ত আটক করা হয়েছে ১৩ হাজার ৮০০–এর বেশি বিক্ষোভকারীকে।








