সরস্বতী: অনন্ত জ্ঞানময় ঈশ্বরের বাক্শক্তির প্রতীক
তারাপদ আচার্য্য
পরমপুরুষের প্রথম অবতার ইচ্ছাশক্তি, জ্ঞানশক্তি ও ক্রিয়াশক্তি। এ তিনের গুণাবতার হল বিষ্ণু, ব্রহ্মা ও রুদ্র। ঋগ্বেদে বাগ্দেবী ত্রয়ীমূর্তি। জ্ঞানময়ীরূপে সব জায়গাতেই তিনি আছেন। বিশ্বভুবনের প্রকাশ তারই জ্যোতিতে। যোগীর হৃদয়ে সেই আলোকবর্তিকা যখন জ্বলে ওঠে, তখন জমাট বাঁধা অজ্ঞানতার রূপ অন্ধকার দূর হয়ে যায়।
সে অবস্থায় সাধকের উপলব্ধি ঘটে অন্তরে-বাইরে; সব জায়গাতেই। এ জ্যোতির জ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞান, এ জ্যোতিই প্রণব, এ জ্যোতিই সরস্বতী। আলোকময়ী বলেই তিনি সর্বশুক্লা। তিন গুণের মধ্যে তিনি সত্ত্বগুণময়ী। জ্ঞানের পরিধি অসীম। অনন্ত জ্ঞানময় ঈশ্বরের বাক্শক্তির প্রতীক এ সরস্বতী, তাই তিনি বাগদেবী। তিনিই বক্র ও সুমেধার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। গতিময় জ্ঞানের জন্যই ঋগ্বেদে তাকে নদীরূপ বলা হয়েছে।
তিনি প্রবাহরূপে কর্মের দ্বারা মহার্ণব বা অনন্ত সমুদ্রে মিলিত হয়েছেন। দেবী সরস্বতীর জ্যোতি বিভূতি এবং নদী সরস্বতীর নিষ্কলুষতার সমন্বয়ে দেবী শ্বেতবর্ণা। কল্যাণময়ী নদীর তটে শ্যাম গায়করা বেদমন্ত্র উচ্চারণে সাধনে নিমগ্ন হতো।
তাদেরই কণ্ঠে উদগীত শ্যামসঙ্গীত শ্রুতি-সুখকর হতো। তারই প্রতীক দেবীর করকমলে। সরস্বতী বিধৌত ব্রহ্মাবর্ত ভূমি-বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত আশ্রয়পূর্বক সাধনা করতেন ঋষিরা। সেই ভাবটি নিয়েই দেবী হন পুস্তকায়শ্রী।
সরস্বতী দেবী জ্ঞানদায়িনী, সর্বশুক্লা। তিনি বাগ্দেবী, নিষ্কলা, নিত্যশুদ্ধা। তিনি প্রশস্ত বুদ্ধিদায়িনী ও মোক্ষদাত্রী। যুগ যুগ ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা জ্ঞান, বিদ্যা ও ললিতকলার দেবী হিসেবে তাকে পূজা করে আসছেন। সরস্বতী পূজা কবে থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সমাজে প্রচলিত, তার সঠিক কোনও ইতিহাস পাওয়া যায় না।
তবে সনাতন ধর্মের ইতিহাস থেকে যা পাওয়া যায়, তা হলো- বৈদিক জ্যোতিরূপা সরস্বতী ও নদী সরস্বতী সম্মিলিতভাবে জ্ঞানের দেবীরূপে পুরাণতন্ত্র ও সাহিত্যে বিপুল শ্রদ্ধা ও ভক্তির অধিকারিণী হয়েছেন। বেদে কিন্তু সরস্বতী প্রধানত নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সরস শব্দের অর্থ জল।
সরস্বতী = সরস (জল)+মতুন (অস্ত্যর্থে)+ঙীন (স্ত্রী)। অতএব সরস্বতী শব্দের আদি অর্থ হলো জলবতী অর্থাৎ নদী। সরস্বতী আরাধনার ক্রমবিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে তার রূপকল্পনাও বহুবৈচিত্র্য লাভ করেছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে দেবীর বাহুর সংখ্যা অধিকতর হলেও সাধারণত তিনি চতুর্ভুজা, পদ্মাসনা, শুক্লাবর্ণা, শুভ্রবর্ণা, বীণা-পুস্তক, জপমালা, সুধাকলসর্ধারিণী, চন্দ্রশেখরা, ত্রিলোচনা। কখনও দেবী দ্বিভুজা। তন্ত্রে সরস্বতী বাগীশ্বরী-বর্ণেশ্বরী সারদা।
মার্কেণ্ডেয় পুরাণে চণ্ডীর উত্তরলীলায় শুম্ভ-নিশুম্ভ নামক অসুরদ্বয়কে বধ করার সময় দেবীর যে মূর্তির কল্পনা করা হয়েছিল, তা মহাসরস্বতী। এ মূর্তি অষ্টভুজা- বাণ, কর্মুক, শঙ্খ, চক্র, হল, মুষল, শূল ও ঘণ্টা ছিল অস্ত্র হিসেবে। তার এ সংহারলীলাতেও কিন্তু জ্ঞানের ভাবটির হানি ঘটে নি। স্কন্দ পুরাণের প্রভাসখণ্ডে দেবী সরস্বতীর নদীরূপে অবতরণের কাহিনী বর্ণিত আছে।
ওই কাহিনীতে নদী সরস্বতীর ভৌগোলিক অবস্থানকে পরিস্ফুট করা হয়েছে। সরস্বতী যে ব্রহ্মার পত্নী তার ইঙ্গিত আমরা পাই। কিন্তু বাগ্দেবী ও সরস্বতীর অভিন্নতা স্পষ্ট নয়। ব্রাহ্মণে স্পষ্টভাবেই সরস্বতীকে বাগ্ বা বাক্যদেবী বলা হয়েছে।
সরস্বতীর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে সূর্যাগ্নির জ্যোতিতে। সূর্যাগ্নির তেজ, তাপ ও চৈতন্যরূপে জীবদেহে বিরাজ করায় চেতনা, জ্ঞানের প্রকৃত কর্ত্রী তো দেবী সরস্বতী। সরস্বতী দেবীর রূপান্তর হয়েছে পৃথিবীতে নদীরূপে এবং সরস্বতীই অগ্নি-ইন্দ্র-মরুৎ অশ্বিদ্বয়ের সংস্পর্শে শত্রুঘাতিনী, ধনদাত্রী এবং বৃহস্পতি-ব্রহ্মাণস্পতির বিদ্যাবত্তার সংযোগে নদী সরস্বতীর সঙ্গে অভিন্নরূপে সরস্বতী তীরে উচ্চারিত বৈদিকমন্ত্রে সংশ্লিষ্ট হয়ে পুরাণে বিদ্যা ও জ্ঞান ভিন্ন অপর জ্ঞানগুলো অন্যত্র স্থাপন করে হলেন বিদ্যাধিষ্ঠাত্রী।
হ্মবৈবর্তপুরাণে গোলোকে বিষ্ণুর তিন পত্নী- লক্ষ্মী, সরস্বতী ও গঙ্গার মধ্যে বিবাদের ফলে গঙ্গার অভিশাপে সরস্বতীর নদীরূপ পাওয়াই হচ্ছে সরস্বতীর পৃথিবীতে সরস্বতী নদী ও সরস্বতী দেবীরূপে প্রতিষ্ঠা হওয়ার তত্ত্ব।
পুরাণে বলা হয়েছে- দেবী সরস্বতী আদ্যা প্রকৃতির তৃতীয় অংশজাত। তিনি বাক্য, বৃদ্ধি, জ্ঞান, বিদ্যা ইত্যাদির অধিষ্ঠাত্রী দেবী। উক্ত গ্রন্থের মতে, সরস্বতী পূজার প্রবর্তক ব্রহ্মা এবং শ্রীকৃষ্ণ। তবে পণ্ডিতরা অনেকেই মনে করেন, সরস্বতী প্রথমে ছিলেন নদী, পরে হলেন দেবী। রমেশচন্দ্র দত্ত লিখেছেন- আর্য্যাবর্তে সরস্বতী নামে যে নদী আছে, তাই প্রথমে দেবী বলে পূজিত হয়েছিলেন।
বর্তমানে গঙ্গা যেমন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপাস্যদেবী হিসেবে পূজিত হয়ে থাকেন, তেমনি বিবর্তনের ধারায় সরস্বতী হলেন জ্ঞানের দেবী। কাশ্মিরী পণ্ডিত কলহন বলেছেন- সরস্বতী দেবী হংসরূপে ভেড়গিরি শৃঙ্গে দেখা দিয়েছিলেন। এরূপ ধারণা অত্যন্ত সঙ্গত। হংসবাহনা সরস্বতীর প্রস্তরমূর্তিও প্রচুর পাওয়া যায়। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, দেবীর এ উভয়চর বাহনটি তিনি ব্রহ্মার শক্তি হিসেবে ব্রহ্মার কাছ থেকে পেয়েছিলেন।
কিন্তু ব্রহ্মা বা সরস্বতী দেবীর বাহনটি পাখি বিশেষ নয়। বেদ ও উপনিষদে হংস শব্দের অর্থ সূর্য। সূর্যের সৃজনী শক্তির বিগ্রহাম্বিতরূপ ব্রহ্মা এবং সূর্যাগ্নির গতিশীল কিরণরূপা ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব শক্তি সরস্বতী দেবীর বাহন হয়েছেন হংস বা সূর্য অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই। তবে সিংহ ও মেষ সরস্বতী দেবীর আদি বাহন ছিল, যা জানা যায় বৈদিক সাক্ষ্য থেকে। পরবর্তীকালে দেবী দুর্গা সরস্বতী দেবীর কাছ থেকে সিংহ ও কার্তিক কেড়ে নিলে সিংহ ও ময়ূর ছেড়ে দিয়ে সরস্বতী দেবী ব্রহ্মার শক্তি ব্রাহ্মণী হিসেবে বাহনটিকে চিরস্থায়ী মর্যাদা দিলেন।’
সরস্বতী বৈদিক দেবী হলেও সরস্বতী পূজার বর্তমান রূপটি আধুনিককালে প্রচলিত হয়েছে। তবে প্রাচীনকালে তান্ত্রিক সাধকরা সরস্বতী-সদৃশ্য দেবী বাগেশ্বরীর পূজা করতেন বলে জানা যায়। উনবিংশ শতাব্দীতে পাঠশালায় প্রতিমাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে ধোয়া চৌকির ওপর তালপাতা, দোয়াত-কলম রেখে পূজা করার প্রথা ছিল।
শ্রীপঞ্চমী তিথিতে ছাত্ররা বাড়িতে বাংলা বা সংস্কৃত গ্রন্থ, শ্লেট, দোয়াত ও কলমে সরস্বতী পূজা করত। শহরে ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই সরস্বতীর প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা করতেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজার প্রচলন শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে।
বর্তমানে সরস্বতী প্রায় সব জায়গায়ই দ্বিভুজা। তার হাতে বীণা অপরিহার্য। বীণা অবশ্যই সঙ্গীত ও অন্যান্য কলাবিদ্যার প্রতীক। অক্ষরমালা বা জপমালাও আধ্যাÍবিদ্যার প্রতীক। শুকপাখিও বিদ্যা বা বাক্যের প্রতীক হিসেবেই সরস্বতীর হাতে শোভা বাড়াচ্ছে। আচার্য যোগেশচন্দ্র রায়ের মতে- দ্বিভুজা বীণাপাণি সরস্বতী প্রতিমা গত ১৫০ বছরের মধ্যে কল্পিতা হয়েছে।
সরস্বতী পূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিদ্যা ও সঙ্গীতের দেবী সরস্বতীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠেয় একটি অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন করা হয়। সরস্বতীর পূজা সাধারণ পূজার নিয়মানুসারেই হয়ে থাকে। তবে এ পূজায় কয়েকটি বিশেষ উপাচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়।
যথা- অভ্র-আবির, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শীষ। পূজার জন্য বাসন্তী রঙের গাঁদাফুলও প্রয়োজন হয়। লোকাচার অনুসারে, ছাত্রছাত্রীরা পূজার আগে কুল খেতে পারে না। পূজার দিন লেখাপড়া বন্ধ থাকে। যথাবিহিত পূজার পর লক্ষ্মী, নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার (দোয়াত-কলম), পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পূজা করার প্রথা প্রচলিত আছে। পূজা শেষে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার প্রথাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের দলবেঁধে অঞ্জলি দিতে দেখা যায়।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম, দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ








