বাংলাদেশে ‘বাবু খাইছো’ তরুণদের কেন আকৃষ্ট করছে?
ইউটিউবে প্রকাশিত হওয়ার দশদিনের মধ্যে ২০ লাখেরও বেশি মানুষ গানটি দেখেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও আলোচনার শীর্ষে রয়েছে ‘বাবু খাইছো’। আবার চট্টগ্রামের হালিশহরে এই নামে রেস্তোরাঁ খুলে ফেলেছেন এক ব্যক্তি।
তরুণ প্রজন্মের কাছে হঠাৎ চটুল কথার এমন একটি গান কেন বিপুল জনপ্রিয়তা পেল সেই প্রশ্ন অনেকের মনে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজবিজ্ঞানী ড. শেখ শফিউল ইসলাম এবং তরুণ প্রজন্মের কয়েকজন প্রতিনিধির সাথে।
কেউ বলছেন উপযুক্ত আদর্শ না থাকাতেই সস্তা বিনোদনে ঝুঁকে পড়েছেন তরুণেরা। কেউ জানালেন, দেশ ও সমাজ নিয়ে কথা বলার সুযোগ না থাকাতে বাস্তবতা থেকে পালিয়ে এই গানে আশ্রয় খুঁজছে কমবয়সীরা। আবার কেউবা এত বিশ্লেষণে না গিয়ে ভাবছেন গানটি কেবল একটি বিদ্রূপ মাত্র!
বাংলাদেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিশাত পারভেজ ‘বাবু খাইছো’ শিরোনামের এ গানটি নিয়ে নিজের অভিমত জানাতে গিয়ে বলেন, ‘তরুণদের অনেকেই আজকাল তাদের প্রিয়জন, মানে গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ডকে ‘বাবু’ বলে সম্বোধন করে। এর উৎপত্তি কোথা থেকে, সে সম্পর্কে জানা নেই। আমার তো মনে হয়, ইংরেজিতে রোমান্টিক পার্টনারকে বেবি বলে ডাকার প্রচলন থেকে এটা বাংলায় বাবু হয়েছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক এবং ইউটিউবে চলতি মাসেই রিলিজ করা হয় গানটি, আর খুব অল্প সময়েই এটি ভাইরাল হয়। সেপ্টেম্বর মাসের ৫ তারিখে ইউটিউবে প্রথমবার আপলোড করা হয় ‘বাবু খাইছো’ শিরোনামের গানটি। প্রিমিয়ার করার পরপরই গানটি লুফে নেন বাংলাদেশের নেটিজেনদের অনেকেই। দিন দশেকের মধ্যে ২০ লাখেরও বেশি বার গানটি দেখা হয়ে গেছে কেবল ইউটিউবেই।
এই গানের শিরোনামে ব্যবহার করা হয়েছে সেই শব্দ যুগল, যা বাংলাদেশের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণরা তাদের কথায় হরহামেশা ব্যবহার করছেন।
কিন্তু এই শব্দ যুগল তরুণদের মধ্যে এত সাড়া জাগালো কেন? কিংবা এমন একটি গানই বা কেন তাদের পছন্দ তালিকায় জায়গা করে নিল? নিশাত পারভেজের মতে, মোবাইল কমিউনিকেশন, তারপর সামাজিক মাধ্যম, প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে যে দূরত্ব তা কমিয়ে দিয়েছে অনেকখানি। প্রতিমুহূর্তেই তারা পরষ্পরের খোঁজ নিতে পারছে।
তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘বাবু খাইছো’ নিয়ে প্রচুর ট্রলও হয়েছে।
তিনি মনে করছেন যে রোমান্টিক পার্টনারকে সম্বোধন, বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে গানের লিরিক, সাথে ভিডিও-কোরিওগ্রাফি – সব মিলিয়ে এই শিরোনামের গানটি তরুণ সমাজের মধ্যে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়েছে।
ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুমতাজ মুমুর অবশ্য এই গান সম্পর্কে রয়েছে একটু ভিন্ন রকমের অভিমত। তার মতে ‘অনেকেই এ ধরনের মিউজিক বেশ উপভোগ করে থাকেন। কিন্তু আসলে গান বলতে আমরা যেমন খুবই গভীর বা মহান ধরনের আর্ট বা শিল্প বুঝি, সেই গভীরতাটা কিন্তু এ ধরনের মিউজিকে নেই।’
বাংলাদেশে এখন তরুণদের মধ্যে গত ৪-৫ বছরে এমন কিছু মিউজিক ভিডিও বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করছে, যেগুলোতে প্রাত্যহিক জীবনে তরুণরা ব্যবহার করে এমন শব্দ বা কথা ব্যবহার করা হয়েছে।
‘বন্ধু তুই লোকাল বাস’, ‘এই যে বেয়াইন সাব’, ‘মাইয়া ও মাইয়া তুই অপরাধী রে’, ‘মাফ কইরা দেন ভাই’ – এই গানগুলো বিভিন্ন ডিজিটাল প্লাটফরমে বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। রাস্তাঘাটে, শপিং মলেও এসব গান শোনা যায়।
বাংলাদেশের মূলধারার সঙ্গীতের সাথে এই গানগুলোর খুব সম্পৃক্ততা না থাকলেও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এগুলো আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়েছে।
ঢাকার চাকরিজীবী নারী কামারুন কণিকা মনে করেন, এর একটা বড় কারণ ‘ব্যঙ্গ করা’ করা। তার মতে, ‘হেট স্পিচ খুব দ্রুত মানুষের অ্যাটেনশন পায়। আমরা চিন্তা-ভাবনা কম করি। এই যে এই গানটা বা অপরাধী টাইপ গান – এগুলো মানুষ ঠিকমতো পুরো গান শোনেও না, কিন্তু একটা-দু’টা লাইন নিয়ে মজা করে।’
বাংলাদেশের বিনোদন জগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুকান্ত হালদারের অভিমত, এই গানের মূল টার্গেট অডিয়েন্স হলেন টিনএজাররা। গানটির কথা ও মিউজিক শুনলেই বোঝা যায়, তাদের কথা ভেবেই গানটির কথা লেখা হয়েছে, মিউজিক কম্পোজিশন করা হয়েছে।
সুকান্ত হালদারের ধারণা, (গানটি তৈরির সঙ্গে জড়িত মীর মারুফ ও মীর ব্রাদার্স বেশ সু-পরিকল্পিতভাবেই কাজটি করেছেন। আর সে কারণেই এখন গানটি নিয়ে এত আলোচনা হচ্ছে। তারা চেয়েছিলেন গানটি এমন হাইপ তৈরি করুক।
তার মতে, এ ধরণের গান অবশ্য জনপ্রিয়তার দিক থেকে খুব বেশী সময় ধরে টিকে থাকে না। প্রকাশের পর দু-তিন মাস বেশ আলোচনা হয়, তারপর হারিয়ে যায়।
গানটির সুরকার একজন ডিস্ক জকি বা ডিজে, মীর মারুফ। তিনি বলেন, তারা মূলত ট্রেন্ডিং কিছু ব্যাপার নিয়ে গান করার চেষ্টা করছেন। যেমন তারা করোনাভাইরাস নিয়ে, কোয়ারেন্টিন নিয়ে গান করেছেন, ঠিক তেমনই গানে ব্যবহার করেছেন একটি বহুল ব্যবহৃত কথা, যা বাংলাদেশে প্রেমিক-প্রেমিকারা তাদের ভালোবাসার মানুষকে বলে থাকেন।
‘এখনকার সম্পর্কগুলোতে কী হচ্ছে, কী ধরনের কথা হয়, সেটাই বলতে চেয়েছি আমরা।’❐








