এই সময়ের কড়চা
মেনে না-নেয়া, নত হয়ে না-থাকার বিপদ আছে বৈকি। সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র কেউই এ কাজ সমর্থন করে না।
ভাবে বেয়াদব। বেয়াদবি সমর্থন করে না এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরাও, বিশেষ করে তারা যারা সরকারি ক্ষমতার আনুকূল্যে বলীয়ান।
যেমনটা ঘটেছে বুয়েটের আবরার ফাহাদের ব্যাপারে। ছেলেটার অভ্যাস ছিল চিন্তাভাবনা করার এবং বিদ্যমান ব্যবস্থায় সে সন্তুষ্ট ছিল না। রাষ্ট্রের কাজকর্ম নিয়ে সে নিজের ফেসবুকে মন্তব্য করেছে। সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া গেছে প্রতিক্রিয়া।
তার পক্ষে বলার লোকও নিশ্চয়ই অনেকে ছিল, কারণ সে অন্যায় কিছু বলেনি, যা বলেছে তা বহুজনের বক্তব্য; কিন্তু তার বিপক্ষে যারা, যাদের মধ্যে ছিল ওই বুয়েটেই সরকার-সমর্থক তার সহপাঠীরা, তারা আর বিলম্ব করেনি, গভীর রাতে তাকে ছাত্রাবাসে তার কামরা থেকে ডেকে নিয়ে এগারো জনে মিলে পিটিয়ে একেবারে মেরেই ফেলেছে; পেছনে থেকে আরও চৌদ্দজন এ মহৎকর্মে সহায়তা দান করেছে। বলেছে সে নাকি জামায়াত-শিবির করত।
পাকিস্তান আমলে শুনতাম যে চতুর্দিকে যত ‘অন্যায়’ ঘটে সব করে কমিউনিস্টরা; বাংলাদেশে কিছুদিন আগে শোনা যেত দায়ী বিএনপি-জামায়াত, এখন বিএনপির জীর্ণশীর্ণ অবস্থা হয়েছে, নেত্রী কারাগারে এবং অসুস্থ, নেতারা মামলার ভারে ও ভয়ে অবসন্ন; ‘অন্যায়’ কাজগুলো এখন তাই বিএনপি আর করতে পারছে না। যা করার জামায়াত-শিবিরই করছে; তারা এতটাই সুসংগঠিত ও সুবিস্তৃত।
আবরারের হন্তারকেরা মৃত অবস্থায় তাকে ধরাধরি করে বাইরে নিয়ে যাচ্ছিল, রাতের অন্ধকারে রাস্তায় নিয়ে গিয়ে নিক্ষেপ করতে পারলেই ল্যাঠা চুকে যেত; পুলিশ বলতে পারত মৃত্যু রহস্যময়, তারা অনুমান করত হয়তো ছিনতাইকারীরা আক্রমণ করেছে, অথবা হতে পারে প্রেমঘটিত কারণে নিহত হয়েছে।
এমনও বলা যেত যে, শিবিরের ছেলে, দলত্যাগ করার তালে ছিল তাই দলের লোকেরাই দিয়েছে শেষ করে। হন্তারকদের দুর্ভাগ্য, রাস্তায় নিয়ে ফেলে দেয়ার পরিচ্ছন্ন কাজটি তারা সম্পন্ন করতে পারেনি; তার আগেই জানাজানি হয়ে গেছে। এবং প্রতিবাদটা হয়েছে ব্যাপক।
ছাত্রছাত্রীদের ভেতর ক্ষোভ ছিল পুঞ্জীভূত, সাবেক ছাত্রছাত্রীরা মর্মাহত হয়েছেন, অভিভাবকরা আতঙ্কিত। ফলে একটা বিস্ফোরণের মতো ঘটে গেল। খুনিদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং তারা ধরা পড়েছে। আবরারের ওপর নির্যাতন কোনো বিচ্ছিন্ন বা একক ঘটনা নয়, এসব অনবরতই ঘটছে। বুয়েটের শিক্ষার্থীরা ধর্মঘট করেছে।
নইলে আবরার-হত্যার ঘটনাও মিলিয়ে যেত অন্ধকারে। তবে ধর্মঘটে কর্তৃপক্ষ যে অত্যন্ত অস্থির হয়েছে তা নয়; সরকার তো দেখা গেছে রীতিমতো উদাসীন।
এখানে আরেকটা ব্যাপার আছে লক্ষ করার মতো। সেটা হল আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলোর কোনোটিই এখন আর ঠিকমতো কাজ করে না।
বুয়েট মনে হচ্ছিল চলছে, কিন্তু স্বাভাবিকতার অন্তরালে সেখানে যে এমন সব অত্যাচার চলছিল, জমে উঠেছিল এমন গভীর অসন্তোষ, তা টের পাওয়া যায়নি, হঠাৎ প্রকাশের সুযোগ পেয়ে অসন্তোষ ভূমিকম্পের সৃষ্টি করে ফেলেছে।
অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্রলীগের দমন-পীড়ন; শিক্ষক নিয়োগে কর্তৃপক্ষের পক্ষপাত, ঘুষ ও দুর্নীতি, উন্নয়নের টাকা-পয়সার ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষ, উপাচার্যদের অমনোযোগ ও অদক্ষতা; ছাত্রীদের ওপর যৌন হয়রানি, সবকিছু মিলিয়ে এখন এমন এক দশা হয়েছে, যেমনটা আমাদের এ অভাগা দেশেও উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে আগে কখনও দেখা যায়নি।
কিন্তু কর্তৃপক্ষের দিক থেকে কোনো উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা বা চাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে না। তারা বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা, ক্ষমতা-প্রতাপ প্রদর্শন ইত্যাদি সবকিছুর সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, কী চাই? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক সমিতি আছে; বছর বছর তাদের নির্বাচনও হয়, কিন্তু ঘুরে ঘুরে তারাই নির্বাচিত হন যারা আগেও ছিলেন, যারা প্রশাসনের সহযোগী; আর প্রশাসন তো অতিঅবশ্যই সরকার-সমর্থক।
প্রশাসন সর্বদাই নত হয়ে থাকে, এবং নত হয় বলেই বৈষয়িক দিক থেকে উন্নতি করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ছাত্রসংসদ নেই। আগে ছিল, এখন নেই। না থাকাটা নিয়মবিরুদ্ধ, কিন্তু কার নিয়ম কে মানে।
এরশাদের পতনের পর দেশে গণতন্ত্রের উত্থান ঘটল, এবং সে-উত্থানের চরিত্র যে কতটা ‘গণতান্ত্রিক’ হতে পেরেছে তার একটা প্রমাণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র-সংসদের ওই অগণতান্ত্রিক অনুপস্থিতি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ থাকলে সন্ত্রাস থাকত না, আবরার নিহত হতো না এবং ‘ছাত্র রাজনীতি বন্ধ চাই’ বলে এখন যে আওয়াজটা বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছে সেটা উঠত না।
আওয়াজটা গণতন্ত্রবিরোধী, নাগরিকদের নাগরিকত্বের প্রাথমিক অধিকারবিরোধী এবং আত্মঘাতী। তবু সে-আওয়াজ উঠেছে। উঠত না বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যদি ছাত্রসংসদ থাকত। ছাত্রসংসদ ট্রেড ইউনিয়ন নয়; তারও বেশি।
ছাত্রসংসদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষাজীবনের সৃজনশীল ও অপরিহার্য অংশ। ওদিকে আবার অরাজনৈতিক মানুষ যে মানুষই নয়, মানবদেহী বন্যপ্রাণী মাত্র, এমন কথা দার্শনিকেরা বলে গেছেন, যে কথাটা বাস্তবে শতভাগ সত্য।
ভীষণ রকমের করুণ বাস্তবতাটা হল এই যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন আর আগের মতো প্রাণবন্ত নয়, গণতান্ত্রিক তো অবশ্যই নয়। আগেও যে খুব প্রাণবন্ত ছিল তা নয়, তবু প্রাণ এখন আগের চেয়েও নিষ্পেষিত।
সমাজের সর্বত্র যেমন বিশ্ববিদ্যালয়েও তেমনি, নত হয়ে থাকাটাই এখন বিধিবদ্ধ। নত হয়ে না থাকলে মরতে হবে, আবরার যেমন মরেছে। স্মরণীয় যে, একাত্তরের যুদ্ধে প্রথম যারা প্রাণ দিয়েছে তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ছিল, শিক্ষকরাও ছিলেন। তাদের অপরাধও ওই একটাই, নত না-হওয়া।
মুক্ত দেশে দেখতে পাচ্ছি যে, বিশ্ববিদ্যালয় আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি, ক্রমাগত নতই হয়েছে। এ দুর্দশা অবশ্য বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। পুঁজিবাদী উন্নতি যা করার তা-ই করছে; উন্নতির সুযোগ করে দিচ্ছে অল্পকিছু মানুষের জন্য, বাদবাকিরা বঞ্চিত হচ্ছে।
আসলে উন্নতির বিরাট ও কঠিন বোঝা ওই বাদবাকিদের অর্থাৎ মেহনতিদের দুর্বল কাঁধের ওপর যে শুধু চেপে বসে আছে তাই নয়, মেহনতিদের শ্রমেই উন্নতিটা ঘটছে।
উন্নতির নির্মম চাপ সামলাতে না পেরে সবকিছু ভেঙে যাচ্ছে বলে অনেকের ধারণা। তাদের ভ্রান্ত বলা যাবে না; অবশ্যই ভাঙছে, আরও ভাঙবে; তবে সেই সঙ্গে ভাগও হয়ে যাচ্ছে, দু’দিকে। একদিকে ভালো অন্যদিকে মন্দ। ভালো হওয়ার কথা পাবলিকের, মন্দ হওয়ার কথা প্রাইভেটের। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ঠিক উল্টোটা প্রমাণ করতে ব্যস্ত রয়েছে।
সে বলছে পাবলিক মোটেই ভালো নয়, প্রাইভেটই ভালো। বলবেই, কারণ তার লালন-পালন প্রাইভেটের কোলে-পিঠে। প্রাইভেট পাবলিককে শোষণ করে। শোষণ করে দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠে। পুঁজিবাদ শোষণের বন্দোবস্ত করে দেয়।
শিক্ষাক্ষেত্রে যা ঘটছে তার সর্বোচ্চ সাক্ষী হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই দুর্দশা। পাবলিক হাসপাতালের মতোই তার দুর্গতি। বাংলাদেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রাইভেটাইজেশন এখন পুরোমাত্রায় সুসম্পন্ন হয়ে গেছে। এমনভাবে ঘটেছে যা পুঁজিবাদী বিশ্বের অন্যত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন।
পাবলিক হাসপাতাল এখন মোটেই নির্ভরযোগ্য নয়, চিকিৎসার জন্য ঘুরতে হয় প্রাইভেটের দরজায় দরজায়। যারা সঙ্গতিপূর্ণ তারা ছোটে বিদেশে। সঙ্গতির অভাব যাদের তারা হয় প্রাইভেট চিকিৎসার দাপটে সর্বস্বান্ত হয়, নইলে মারা পড়ে। পাবলিক সংকুচিত হয়েছে; হস্তান্তরিত হয়ে যাচ্ছে প্রাইভেটের চোটপাটে।
অতবড় আদমজী পাটকল, একাত্তরের পর ব্যক্তিমালিকানা ত্যাগ করে যেটি চলে গেছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানায়, ধপ করে সেটি পড়ে গেল মাটিতে। মরা হাতির দামটাও পাওয়া গেল না। নানাজনে নানাভাবে খাবলে খাবলে নিল তার সম্পত্তি। এটি শুধু যে ঘটনা তা নয়, প্রতীকও বটে। সব ক্ষেত্রেই চলছে একই রকম ব্যাপার।
প্রাইভেটের যেসব গুণ- লুণ্ঠন, প্রতারণা, সম্পদ-পাচার, কর ফাঁকি দেয়া- অভূতপূর্ব দাপটের সঙ্গে সবকিছু শুরু হয়ে গেল। বাজার হয়ে দাঁড়িয়েছে বিনিময়ের একমাত্র মাধ্যম এবং বাজার রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা নয়, থাকেওনি।
সবকিছু পরিণত হয়েছে পণ্যে। টাকা দিলে খুনি ভাড়া পাওয়া যায়, ঘুষ দিলে সবাই বশ হয়। ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের বেলায় লোকে ন্যায়-অন্যায় বোঝে না, আপন-পর চেনে না, বদ্ধউন্মাদের মতো কাজ করে। সাগিরা মোর্শেদের হত্যাকাণ্ডের সত্য উন্মোচন করে যেদিন খবর বেরুল পত্রিকায় সেদিনই তো পড়লাম আরেক খবর, সুনামগঞ্জের এক গ্রামে তুহিন নামে পাঁচ বছরের একটি শিশুকে ঘুমন্ত অবস্থায় মেরে ফেলা হয়েছে।
কারা করল ওই কাজ? করেছে তুহিনের নিজের বাবা ও চাচা। চাচাতো ভাইদের একজনও লাগিয়েছে হাত। কেন করল? উদ্দেশ্যটা কী? উদ্দেশ্য অন্য কিছু নয়, প্রতিপক্ষকে খুনের আসামি বানানো।
প্রতিপক্ষের সঙ্গে এই পক্ষের বিরোধ বেধেছে, সম্পত্তি নিয়ে। সম্পত্তি অনেক দামি- সন্তানের তুলনায়। রাজায় রাজায় যুদ্ধে উলুখাগড়ার প্রাণ যায় শুনেছি আমরা, পিতার হাতে আপন শিশুর প্রাণ যায় আগের দিনে শুনিনি। প্রবাদ-প্রবচনে এখন সংশোধন আনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
আগের কাল গত হয়েছে, এখন আমরা পুঁজিবাদী, এবং অনেক বেশি উন্নত। রাজা নেই তাতে কী, আপনজনেরা আছে। সাগিরাকে ভাড়া-করা লোক দিয়ে মারায় তার ভাসুর, ঘুমন্ত তুহিনকে নিজ হাতে মারে তার বাবা। সাগিরা গেলেন নতি স্বীকার করেননি বলে, তুহিন মরল তার বাপের ঘরে জন্মেছিল বলে। নিরাপত্তা কে দেবে এখন মানুষকে? পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তো মুনাফাকেই বাঁচাবে, মানুষ মরল কী বাঁচল সে নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিপন্ন; কয়েকটা ইতিমধ্যেই বসে পড়েছে, বাকিগুলো বসে পড়ার পথে। বসে পড়লে শয্যাশায়ী হতে কী অসুবিধা! এর মধ্যে দেখছি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশ গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা আরও উঠবে। সংখ্যায় বাড়ছে, গুণেও বাড়বে; পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেখানে গিয়ে পড়াবেন, এখন যেমন পড়াচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি যে বলেছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সন্ধ্যার পর প্রাইভেট হয়ে যায়, সেটা নিশ্চয়ই না-জেনে বলেননি।
বস্তুত যেমনভাবে প্রাইভেট ক্লিনিক ও প্রাইভেট হাসপাতালের কাছে পাবলিক হাসপাতাল মার খাচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নাস্তানাবুদ হবে প্রাইভেটের হাতে। প্রাইভেট কোম্পানির বাস, প্রাইভেট গাড়ি, এরা যেভাবে পাবলিককে বিদ্রূপ করে, শিক্ষার ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটবে।
ইতিমধ্যে তো এটাও দেখা যাচ্ছে যে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তুলনায় কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসায় ভর্তি বেশি। মূলধারার শিক্ষা পরীক্ষার আক্রমণে এখন বিপর্যস্ত। আগে একটা সমাপনী পাবলিক পরীক্ষা হতো, এখন অগ্রে ও পশ্চাতে একটি করে জুড়ে দেয়া হয়েছে। একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষামনস্ক করে তোলা হচ্ছে।
অর্থাৎ উৎসাহিত করার আয়োজন চলছে লেখাপড়ার চেয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতিকে বড় করে দেখতে, কোচিং সেন্টার ও গাইডবুকের ওপর আরও অধিক নির্ভরশীল হতে, এমনকি নকল করতেও। পরীক্ষা আছে নকল নেই এমন তো হতে পারে না।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের সরকার তিন বছরের অনার্স কোর্সের সমাপ্তিতে একটি সমাপনী পরীক্ষার ব্যবস্থার জায়গাতে প্রতি বছরে দুটি করে পরীক্ষার বন্দোবস্ত করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পরিবর্তে পরীক্ষাকে আগের তুলনায় অধিক জরুরি করে তুলে শিক্ষার মানের ওপর ঘা বসিয়েছিল; বর্তমান সরকার ঘা দিয়েছে একেবারে গোড়া পেঁচিয়ে; প্রাথমিক স্তরেই ছোট ছোট শিশুদের ঘাড় ধরে ঠেলে দিয়েছে পরীক্ষা কেন্দ্রে।
শিক্ষা ব্যাপারটা পরীক্ষা-দানবের অত্যাচারের জন্য সংরক্ষিত এলাকায় পরিণত করা হচ্ছে। শিক্ষা থেকে আনন্দ ও সৃষ্টিশীলতা পলায়ন তৎপরতা এখন সর্বত্র দৃশ্যমান।
ইংলিশ মিডিয়াম কিন্তু একরকমই আছে। সেখানে ঘন ঘন পরীক্ষা নেই, প্রশ্ন ফাঁস নেই, নকলও চলে না। এবং পিটিয়ে কাঁঠাল পাকানোর মতো জোর করে ভালো ফল দেখানোর সরকারি তৎপরতাও নেই।
তদুপরি ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষকরা ভালো বেতন পান, তারা ভালো থাকেন, বাংলা মিডিয়ামের শিক্ষকদের মতো তাদের রাস্তায় নেমে অনশনে বসতে হয় না, পুলিশের লাঠিপেটা সহ্য করার দায়ও নেই।
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট বানায়। তারা অর্থ বিদেশে পাচার করে, হুন্ডি চালু রাখে, ক্যাসিনো বসায়, ২৫ টাকার পেঁয়াজকে ২৬০ টাকায় তুলে দেয়। আমাদের বাপ-চাচারা হালি ধরে ইলিশ মাছ কিনতেন, সে তো এখন স্বপ্ন। আমরাও হালি ধরে কমলালেবু কিনেছি, এবার হালি ধরে কিনতে হল পেঁয়াজ।
বাংলাদেশে অসম্ভব কী! সিন্ডিকেট লবণের দামও উঁচুতে উঠাতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত পারেনি। হতে পারে তাদের পরামর্শদাতারা লবণ নিয়ে পাকিস্তানি কেলেঙ্কারির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। সেটা ছিল পাকিস্তানের প্রথম যুগ, ১৯৪৯-এর দিকে। ১২ আনা সেরের লবণের দাম তোলা হয়েছিল ১৬ টাকাতে।
শাসকশ্রেণির জন্য এর পরিণতিটা হয়েছিল ভয়াবহ; ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকার একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। এখনকার সরকারকে অবশ্য নির্বাচন নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলে; ভোটারবিহীন নির্বাচন, মধ্যরাতে ব্যালটবাক্স ভর্তির নির্বাচন, এসব দস্তুর চালু হয়ে গেছে, ভবিষ্যতে আরও অভিনব ব্যবস্থা উদ্ভাবিত হবে এমনটা আশা করা নিতান্ত দুরাশা নয়।
তবে, তবুও, পাবলিক বেশি চটে গেলে কী না কী ঘটিয়ে ফেলে এমন আশঙ্কা তো উড়িয়ে দেয়া যায় না। সে জন্যই হয়তো আত্মসংবরণ করা হয়েছে। লবণের দাম উপরের দিকে রওনা দিয়েও শেষ পর্যন্ত ক্ষ্যামা দিয়েছে। তবে পেঁয়াজের দামের সঙ্গে সহমর্মিতা প্রদর্শন করে নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য দ্রব্যের মূল্য বিলক্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সংবাদপত্রের ভাষায়- ওই উচ্চতাতেই ‘স্থিতিশীল’ রয়েছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়








