Our Concern
Ruposhi Bangla
Hindusthan Surkhiyan
Radio Bangla FM
Third Eye Production
Anuswar Publication
Ruposhi Bangla Entertainment Limited
Shah Foundation
Street Children Foundation
June 13, 2026
হেডলাইন
Homeনির্বাচিত কলামবিভ্রান্তিকর তালিকার ব্যাখ্যা দিন

বিভ্রান্তিকর তালিকার ব্যাখ্যা দিন

বিভ্রান্তিকর তালিকার ব্যাখ্যা দিন

 
মুক্তিযুদ্ধের ৪৮তম বিজয়বার্ষিকী উদযাপনের মধ্য দিয়ে ঢাকা এবং বড়-ছোট প্রতিটি শহর-গ্রাম-গঞ্জে বিস্ময়কর এক আনন্দ-উল্লাস লক্ষ্য করা গেছে। এই আনন্দ-উল্লাস বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি। আমাদের নতুন প্রজন্ম যে ইতিহাস সচেতন; দেশমাতৃকার প্রতি তাদের আবেগ-ভালোবাসা যে অকৃত্রিম; তারা যে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সিক্ত- তারই স্বাক্ষর রেখেছে আমাদের নতুন মানুষেরা- এ আমাদের পরম তৃপ্তি।
 
এবারের বিজয় দিবসের প্রাক্কালে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ কাজ সম্পাদিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থানকারী, মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহায়তাকারী রাজাকার ১০ হাজার ৭৮৯ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। অনস্বীকার্য, স্বাধীনতাবিরোধী এবং মুক্তিযুদ্ধের ঘাতক পাকিস্তান বাহিনীর দোসরদের তালিকা প্রকাশের দাবিটি ছিল বহুকালের। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন, এই তালিকাটি তারা প্রণয়ন করেননি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সরকারি নথিপত্রে যা আছে, তাই প্রকাশ করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে বাকি স্বাধীনতাবিরোধীদেরও তালিকা প্রকাশ করা হবে।
 
মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার বাহিনী ছিল পাকিস্তান সরকারের পেটোয়া বাহিনী, যাদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। জেনারেল নিয়াজির বইতে এদের সংখ্যা ৫০ হাজারের ওপর বলা হয়েছে। এ ছাড়াও ছিল জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগ কর্মীদের দ্বারা গঠিত বাহিনী, যেমন আলবদর, আলশামস, মুজাহিদ ও শান্তি কমিটি, যারা ছিল রাজনৈতিক বাহিনী। এদের মধ্যে আলবদর ও আলশামস বাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ ভয়ংকর সব হত্যাকাণ্ডে জড়িত হয়েছিল। তবে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে এদের প্রায় সবাইকে স্বাধীনতাবিরোধী বা ‘রাজাকার’ নামে অভিহিত করা হয়।
 
বলা বাহুল্য, তালিকা প্রকাশের ঘটনাটি সারাদেশেই ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত করেছে। সেটিই স্বাভাবিক। কারণ, যে রাজাকাররা মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের সাধারণ মানুষকে নিপীড়ন করেছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়েছে; মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও সাধারণ গ্রামবাসীর ওপর সীমাহীন অত্যাচার করেছে এবং যাদের অনেকেই আবার ১৯৭৫-এর রক্তাক্ত পালাবদলের পর হর্তাকর্তা ও সমাজনিয়ন্ত্রক হয়েছে, তাদের নামের তালিকা নতুন প্রজন্মের জানা উচিত বৈকি। ইতিহাসের প্রয়োজনেও স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা সংরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন।
 
কাজেই আমরা অনেকেই মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছি। একই সঙ্গে এই সতর্কও করেছি যে, তালিকাটি যেন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পাদন করা হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশের পর এবং পত্রপত্রিকার প্রতিবেদনে বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে যে খবরাখবর প্রকাশিত হয়েছে, তাতে বিস্মিত না হয়ে উপায় থাকছে না। তালিকায় স্থান পাওয়া বেশ কিছু নামের ব্যাপারে প্রবল আপত্তি উঠেছে। এমনকি এ অভিযোগও পাওয়া গেছে; তালিকায় স্থান পাওয়া এমন নামও আছে, যারা আবার সরকারের তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ সন্তান! শুধু তাই নয়; একাত্তরে যার বাবাকে পাকিস্তানি সেনারা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করেছে, তার সন্তানের নামও এসেছে স্বাধীনতাবিরোধী তালিকায়!
 
এ রকম বহুবিধ অসঙ্গতিপূর্ণ চিত্র পত্রপত্রিকায় সবিস্তারে লিখেছে। লিখেছে, বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রাম কমিটির সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে পরিচিত ব্যক্তি, এমনকি সাবেক জাতীয় পরিষদ সদস্য এবং সর্বমহলে পরিচিত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাও এ তালিকায় রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন! এর ফলে তালিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মুক্তিযোদ্ধাসহ সংশ্নিষ্টদের পরিবার, স্বজনরা ও সাধারণ মানুষ।
 
বিভ্রান্তি আরও ঘটেছে নামের। আবার পিতার নাম বা ঠিকানা না থাকার কারণে। যেমন রাজশাহী অঞ্চলের গোলাম আরিফ টিপুর নাম যখন দেখা গেছে, তখন অনেকেই মনে করছেন, তিনি হয়তো হবেন সেই গোলাম আরিফ টিপু, যিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর, যিনি আজীবন প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনের মানুষ এবং একই সঙ্গে ভাষাসংগ্রামী। একই নামে আর কোনো ব্যক্তি আছেন কি-না সেটিও এ তালিকা দেখে শনাক্ত করার উপায় থাকেনি। কারণ সেখানে পিতার নাম বা পূর্ণ ঠিকানা নেই। অন্যদিকে তালিকায় দেখা যায় ডা. মনীষা চক্রবর্তীর বাবার নাম প্রকাশিত হয়েছে রাজাকারের তালিকায়! অথচ তার বাবা তপন কুমার চক্রবর্তী একজন গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা, যিনি মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান। মনীষার দাদা আইনজীবী সুধীর কুমার চক্রবর্তীকে পাকিস্তানি সৈন্যরা বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। তার সহধর্মিণী উষা রানী চক্রবর্তীকে রাজাকারের তালিকায় ৪৫ নম্বরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
 
আমি মনে করি, প্রকাশিত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত কিছু নাম নিয়ে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার দাবি রাখে। একই নামে আরও কেউ আছেন কি-না, সেটিও বিচারের দাবি রাখে। সে কারণেই দ্রুত এবং পূর্ণাঙ্গ সতর্কতার সঙ্গে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নামগুলো যাচাই করা প্রয়োজন। এই যাচাই কেবল আমলাতান্ত্রিকতার ওপর নির্ভরশীল হলে চলবে না। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যারা চর্চা করেন, গবেষণা করেন, সম্পৃক্ত করতে হবে তাদেরও।
 
মন্ত্রণালয়ের প্রথম দফার তালিকাটি নিঃসন্দেহে ইতিহাসের দায় শোধ করার ক্ষেত্রে একটি অগ্রগতি। দেশের স্বাধীনতা যোদ্ধা এবং মিত্র ও শত্রুদের মুখগুলো যেন নতুন প্রজন্মের মানুষ চিনতে পারে। কিন্তু এই তালিকায় যেভাবে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে, যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ। মনে রাখতে হবে, তালিকাটি প্রকাশ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ যখন প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো ইতিহাস। প্রয়োজনীয় কাজটি আগে হয়নি, যদিও স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধুর আমলে দালাল আইনের মাধ্যমে ৩৭ হাজারের মতো রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এদের বিচার শুরু হয়েছিল ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এবং অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে এদের মধ্য থেকে ২৬ হাজারকে মুক্ত করা হয়েছিল এবং নানাবিধ দণ্ডে ৭৫২ জনের বিচার সম্পন্ন হয়েছিল। যে ১১ হাজারকে শেষ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগে জেলে আটকে রাখা হয়েছিল, তাদেরসহ দণ্ডপ্রাপ্তদেরও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে জেনারেল জিয়াউর রহমানের আমলে। এসব ইতিহাসের বিষয়; অভিযোগ নয় কেবল।
 
মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, তালিকাটি প্রকাশে সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি ছিল। আমি মনে করি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যত দ্রুত সম্ভব এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা বা প্রয়োজনীয় সংশোধনী দেওয়া উচিত। স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা প্রকাশ করতে গিয়ে স্বাধীনতার সপক্ষের কেউ হয়রানি বা ভাবমূর্তিহানির শিকার হতে পারেন না। বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে গ্রেপ্তারকৃত এবং পলাতক ঘাতক-দালালদের আদালতে হাজির হওয়ার জন্য যে গেজেট হয়েছিল, অনেকেই মনে করেন, সেই গেজেটভুক্ত যাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল, তাদের নাম পাওয়া খুব সংকটের হবে না।
 
অস্বীকার করার উপায় নেই, ১৯৭৫-এর পর যেসব সামরিক ও আধা-সামরিক সরকার এসেছে, তারা পরিকল্পিতভাবেই রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী ও শান্তি কমিটির সদস্যদের তালিকা নষ্ট করেছে। সংশ্নিষ্ট অফিস থেকেও এ সংক্রান্ত নথিপত্র নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এসব লোপাট শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রথম তালিকায় দেখা গেছে, এতে এমন কিছু লোকের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যারা পঁচাত্তরের পর বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী এমনকি রাষ্ট্রপতির পদও লাভ করেছিলেন! বলা বাহুল্য, এই অপকর্ম শুধুই সাধারণ অপকর্ম নয়, বরং জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
 
সংশ্নিষ্টদের অনেকেই মনে করেন, যেভাবে তালিকাটি প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে বলে মনে হয় না। স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিটি রাজনৈতিক দল, বাহিনী তথা রাজাকার, আলবদর, আলশামস, মুজাহিদ, শান্তি কমিটির আলাদা তালিকা হওয়া উচিত ছিল। তাদের অপরাধের বিবরণ, রাজনৈতিক পরিচিতি, এমনকি স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিচয়ও উল্লেখ থাকা উচিত, যাতে নতুন প্রজন্ম জানতে পারে- স্বাধীনতাবিরোধী কারা, কী তাদের অপরাধ, কারাই-বা তাদের পুনর্বাসন করেছে।
 
আমি মনে করি, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক শক্তির অর্জন বা উদ্যোগকে বিতর্কিত করার সুযোগ দেওয়া সঙ্গত কাজ নয়। এই ভুল বা বিভ্রান্তিগুলো যদি অসতর্কতার কারণে ঘটে থাকে, তাহলে অনতিবিলম্বে এর ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং তার সংশোধন করতে হবে। আর যদি এগুলো পরিকল্পিত অপকর্ম হয়, তাহলে সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ দেশের ইতিহাস নিয়ে এই অসচেতনতা বা ব্যর্থতা কেউ মেনে নিতে পারে না।
 
যাই হোক, তালিকাটি যেন স্বল্পতম সময়ে পুনর্যাচাই করা হয়, যাতে ভুল বা বিভ্রান্তির সুযোগ না থাকে। প্রতিবন্ধকতা যতই আসুক, ইতিহাসের নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই ইতিহাসকে সংরক্ষণ করতে হবে।
 
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক
Share With:
Rate This Article