পুতিনের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠছেন শি চিনপিং!
অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন ও বিদেশে আগ্রাসনের পাশাপাশি চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সাম্রাজ্য বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়েও চিন্তিত হওয়া উচিত। এমনটা মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে চীনের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছেন শি চিনপিং। এ ছাড়াও আঞ্চলিক সম্প্রসারণবাদ নীতিমালা বাস্তবায়নে কঠোর হয়ে উঠছেন চীনের প্রেসিডেন্ট। নিজেকে পরিণত করছেন একজন স্বৈরশাসক হিসেবে।
বিশ্বের অন্যান্য স্বৈরশাসকের মতো চিনপিংয়েরও কিছু কোমল দিন রয়েছে। চলতি বছর মা দিবসে চিনপিংকে তার ৯৬ বছর বয়সি মা কুই চিংয়ের হাত ধরে হাঁটতে দেখা যায়। তার মা কুই চিং কমিউনিস্ট পার্টির একজন সাবেক নেত্রী ছিলেন।
চিনপিং জানান, যখন অনেক মা তার শিশুদের কোনো গল্প বা ছড়া পড়িয়ে থাকেন সেখানে তার মা তাকে হকিশ সাউদার্ন সং রাজবংশের জেনারেল ইউ ফে এর গল্প শুনিয়েছিলেন।
জেনারেল ইউ ফে তার পিঠে উল্কি করেছেন যে- ‘চূড়ান্ত আনুগত্যের সঙ্গে নিজের দেশকে সেবা করো’। এ উক্তি চিনপিংকে অনুপ্রাণিত করেছে বলে দাবি চীনা প্রেসিডেন্টের।
চিনপিংয়ের নৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে আরও নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন কুই চিং। চিং পিংয়ের প্রাথমিক জীবনের অনগ্রসরতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্যের জন্য কুই চিং পার্টির ঊর্ধ্বতন নেতাদের কাছে সুপারিশ করেছিলেন। এমনটা জানিয়েছেন সিসিপি সেন্ট্রাল পার্টি স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চাই জিয়া। বর্তমানে তিনি নির্বাসনে আছেন।
১৯৮০ সালে কুই হেবেই প্রদেশের পার্টিপ্রধানের কাছে চিংপিংকে উন্নতি করতে সহায়তা করার জন্য একটি চিঠি লিখেন। চাই জিয়া জানান, মায়ের অব্যাহত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও চিনপিং তার কর্মদক্ষতাকে এগিয়ে নিতে পারছিলেন না। কিন্তু তার মা হাল ছেড়ে দেননি।
১৯৯২ সালে নতুন পার্টিপ্রধান ফুজিয়ানের কাছে একটি সুপারিশপত্র লিখেন কুই চিং। তারপর তাকে (শি চিনপিং) বদলি করা হয়, এ সময় তার ক্যারিয়ার সামনের দিকে এগুতে শুরু করে।
পরিবারের অন্য সদস্যরাও চিনপিংকে তার ঘাটতিগুলো কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। তা ছাড়া চিনপিং তার বাবা শি ঝংজুনের দ্বারাও বেশ প্রভাবিত হন। ঝংজুন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন।
এ ধরনের বিভিন্ন সহায়তার ফলে কমিউনিস্ট পার্টিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন শি চিনপিং। কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন উচ্চপদে দায়িত্ব পেতে থাকেন চিনপিং। ২০১২-১৩ সালে তিনি পার্টির উচ্চ পর্যায়েসহ সামরিক ও সরকারি চাকরির উচ্চ পদে পৌঁছান।
এরপরই প্রেসিডেন্ট পদে দায়িত্ব পালনের মেয়াদ বিলুপ্ত করার পদক্ষেপ নেন শি চিনপিং। এর মাধ্যমে তিনি আজীবন চীনের রাষ্ট্রপতি থাকার জন্য নিয়ম পরিবর্তন করেন। সম্প্রতি কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে এ নিয়ম অনুমোদন করেন শি চিনপিং।
ব্যক্তিগত ক্ষমতার এমন বৃদ্ধির চিত্র চিনপিংকে ইতিমধ্যেই মাও সেতুং এর পর সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ভয়ংকর নেতৃত্বে পরিণত করেছে। তবে চিনপিংয়ের অনেক বড় বড় নীতিমালা ব্যর্থ হয়েছে। এসব নীতি চীনতে পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে।
চিনপিংয়ের শাসনামলে চীনের সাবেক প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও এবং জিয়াং জেমিনের শাসনামলের সমষ্টিগত নেতৃত্বের চর্চা বিলুপ্ত হয়েছে। এ ছাড়াও চীনের সাবেক কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের প্রেসিডেন্ট দেং জিয়াওপিংয়ের বাজার সংস্কার ও প্রতিযোগিতা নীতি থেকেও সরে এসেছেন চিনপিং। পাশাপাশি চীনের স্থিতিশীল উন্নতি নিয়ে জিয়াওপিংয়ের মূল দিকনির্দেশনাও বাতিল করেছেন চিনপিং।
এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে চীনকে উল্টো পথে পরিচালনা করছেন শি চিনপিং। দমনমূলক মাও-যুগের আদলে প্রশাসনের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা, ব্যবসা, শিল্প, ভূমি ও মানুষকে একমুখী করার মাধ্যমে একনায়ক হয়ে উঠেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট।
‘শি চিনপিংয়ের চিন্তাধারা’কে রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি অনুশীলনে পরিণত করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট। এর মাধ্যমে উগ্র-জাতীয়তাবাদ, দ্রুত সামরিকায়ন, আঞ্চলিক সম্প্রসারণবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের নিরুৎসাহিতকরণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাত, বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ, একাডেমিয়া ও গণমাধ্যমকে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি অনুগত হতে বাধ্য করা হচ্ছে। বিশেষ করে এসব প্রতিষ্ঠানকে শি চিনপিংয়ের প্রতি অনুগত হতে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে।
সমালোচকরা শি চিনপিংয়ের এমন এক মূর্তি দাঁড় করিয়েছেন যাতে তাকে ভয়ংকর, বদ মেজাজী, স্বৈরাচার ও বিরক্তিকর চরিত্র হিসেবে ফুটিয়ে তোলে। এসব চিত্র গত সপ্তাহে তার বিরুদ্ধে একটি ক্যু এর গুজবকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল।








