আজ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ৮৫তম জন্ম বার্ষিকী
আজ ২৩ জুন। আজ ৮৫ বছরে পা দিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এই ইমেরিটাস অধ্যাপকের আজ জন্মদিন। শ্রেণিকক্ষ থেকে অবসর নিয়েছেন বহু আগে। কিন্তু গবেষণা বা আন্দোলন থেকে নন। বরং তাঁর ব্যস্ততা আরও বেড়েছে। এখনও কাজেই ডুবে থাকতে চান। কাজের মধ্য দিয়ে নতুন সময়কে আবাহন করতে চান বাম প্রগতিশীল এই ভাবুক ও কর্মী।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ৮৫তম জন্মদিন আজ। এই খ্যাতিমান প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ, রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তকের জন্ম ১৯৩৬ সালে মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার বাড়ৈখালী গ্রামে। তার বাবা হাফিজ উদ্দিন চৌধুরী ও মা আসিয়া খাতুন। বাবার চাকরিসূত্রে তার শৈশব কেটেছে রাজশাহীতে ও কোলকাতায়। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুল, নটরডেম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর গবেষণা করেছেন যুক্তরাজ্যের লিডস্ এবং লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ১৯৫৭ সালে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী পেশায় সাহিত্যের অধ্যাপক এবং অঙ্গীকারে লেখক। এই দুই সত্ত্বার মধ্যে যে দ্বন্দ্ব তা মোটেই বৈরী নয়, অবৈরী- পরস্পরের পরিপূরক এবং সম্পূরক। আর এ কারণেই তার সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা এবং জীবন তপস্যা একই ধারায় প্রবহমান। তার ব্যক্তি জীবন এবং লেখক জীবনের মধ্যে নেই কোনও ব্যবধান। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক। সে পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে তিনি একটি সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘নতুন দিগন্ত’ সম্পাদনা এবং প্রকাশ করছেন এবং ‘সমাজরূপান্তর অধ্যায়ন কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজে যে রূপান্তর ঘটছে তা পর্যবেক্ষণ করছেন। পত্রিকা প্রকাশ এবং সমাজ রূপান্তর অধ্যায়ন কেন্দ্র এই দুইয়ের লক্ষ্য সমাজের পবির্তনকে প্রভাবিত করা এবং এ আন্দোলনকে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র বা সমাজ গঠনের দিকে নিয়ে যাওয়া।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাম্যবাদী রাজনৈতিক দর্শন সবার কাছে পরিষ্কার। মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠার লড়াইকে এগিয়ে নিতে তিনি সক্রিয়। তিনি সবসময়ই তার অবস্থানে অবিচল ও অনড়। কোনও রাষ্ট্রীয় প্রলোভন তার অবিচল অবস্থান থেকে টলাতে পারে নি তাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট কর্তৃক দুবার উপাচার্য হওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। সমাজ বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তার কথা তার প্রত্যেক প্রবন্ধের মধ্যে যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে প্রবন্ধগুলোর সমষ্টিগত উপস্থাপনার মধ্যেও। সাহিত্যিক জীবনে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন মূলত দুটি বিষয়ে।
একটি সাহিত্য অপরটি সংস্কৃতি। তিনি যে বিষয়েই লেখেন না কেন তাতে আদর্শিক বিবেচনাকে কখনোই উপেক্ষা করেন না। তাঁর লেখা এবং বক্তব্য যেমন গভীর তেমনি উপস্থাপনায় প্রীতিপদ। পেশায় তিনি শিক্ষক কিন্তু তার রচনা এবং বক্তব্যে কোনো শিক্ষকতা নেই। যা আছে তা হলো গভীর দার্শনিকতা ও ইতিহাস চেতনা।
ইতিহাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রিয় বিষয়। সাধারণভাবে জাতীয়তাবাদ এবং বিশেষভাবে বাঙালির ইতিহাসধারায় জাতীয়তাবাদের বিবর্তন ও প্রভাব তাঁর নানা গবেষণাগ্রন্থের প্রিয় বিষয়। ১০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত তার জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি বইটি ২০১৫ সালে প্রথম আলো বর্ষসেরা গ্রন্থের পুরস্কার পেয়েছে। বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদকসহ বহু সম্মাননা পেয়েছেন।
কর্মজীবনে তিনি ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন। দুবার তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের উপাচার্য নিয়োগের প্যানেলে মনোনয়ন পেলেও ভিসি পদ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ওসমানী উদ্যান, লালন ফকিরের আখড়া, আড়িয়ল বিল রক্ষাসহ নানা আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যুক্ত থেকেছেন দেশের নানা গণতান্ত্রিক ও সামাজিক আন্দোলনে। বর্তমানে তিনি ‘সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী সংঘে’র আহ্বায়ক।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সমাজ বাস্তবতায় সচেতন। সারাজীবন তিনি শাসকশ্রেণীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখেছেন। এটাকেই সাহিত্যে প্রধান মাধ্যম হিসেবে নিয়েছেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ভাষায়, ‘কথাটা শুনতে ভালো যে, সাহিত্য পরিপূর্ণরূপে অরাজনৈতিক, কিন্তু এ একটা মিথ্যে কথা। কেবল যদি মিথ্যাই হতো তবে মস্ত কোনও দোষ ছিল না, কেননা সত্য থাকলে মিথ্যাও থাকবেই। বঙ্কিমচন্দ্র অযথার্থ বলেন নি যে, নিত্য মল্লযুদ্ধে বল বাড়ে। এবং যে-সত্য মিথ্যাভীরু তার পলাতক ও অপোগন্ড স্বভাবের প্রতি মিল্টনের বিতৃষ্ণা সর্বজনীনতার দাবিদার। সাহিত্যের রাজনীতি-নিরপেক্ষতার দাবিতে কেবল মিথ্যা নেই, প্রতারণাও আছে।’








